একটি ছোট হেলিকপ্টারের মহাকাব্য |
লাল ধুলোয় মোড়া মঙ্গলের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে, যেখানে বাতাস পৃথিবীর চূড়ান্ত শিখরের মতোই দুর্বল, সেখানে এক ক্ষুদ্র কিন্তু অসাধারণ অভিযাত্রী অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। তার নাম ইনজেনুইটি।
শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ মঙ্গলপানে চেয়ে থেকেছে, কল্পনা করেছে একদিন যদি সেখানে পৌঁছানো যায়! প্রথমে রোভাররা নামল—কিউরিওসিটি, পারসিভিয়ারেন্স, তারা মঙ্গলের ভূমি চষে বেড়ালো। কিন্তু এবার স্বপ্ন আরো বড় হলো: মঙ্গলের আকাশে কি কোনো দিন কিছু উড়তে পারবে? পৃথিবীতে উড়ান সহজ; বাতাসের ঘনত্ব বেশি, অক্সিজেন পর্যাপ্ত, ইঞ্জিনগুলোও শক্তিশালী। কিন্তু মঙ্গলের বাতাস পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ১% ঘন—যেখানে ওড়ার কথা কল্পনাই অসম্ভব! তারপরও, নাসার বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখলেন।
একটি ব্যতিক্রমী উড়োযানের জন্ম
নাসার প্রকৌশলীরা এক ক্ষুদ্র, সৌরশক্তি চালিত হেলিকপ্টার তৈরি করলেন, যার ওজন মাত্র ১.৮ কেজি (৪ পাউন্ড)। কিন্তু ছোট হলেও এর শক্তি ছিল বিশাল। এর ব্লেডগুলো মানুষের হাতের চেয়ে বড়, এবং প্রতি মিনিটে ২,৪০০ বার ঘুরতে পার—যা পৃথিবীর যে কোনো হেলিকপ্টারের চেয়ে ছয় গুণ দ্রুত! কিন্তু সমস্যা ছিল আরেকটি: মঙ্গলের দূরত্ব এতটাই বেশি যে, ইনজেনুইটি কে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। পৃথিবী থেকে কমান্ড পাঠালে তা পৌঁছাতে মিনিট কয়েক লেগে যাবে, তাই কোনো পাইলট তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ২০২১ সালে, পারসিভিয়ারেন্স রোভারের নিচে বাঁধা অবস্থায়, *ইনজেনুইটি* লক্ষ লক্ষ মাইল পাড়ি দিল মহাশূন্যের এক বিপদসঙ্কুল যাত্রা। অবশেষে, সে পৌঁছালো জেজেরো ক্রেটারে—একটি প্রাচীন হ্রদের অববাহিকায়, যেখানে কোনো এক সময় প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারতো!
অন্য এক জগতে প্রথম উড্ডয়ন
১৯ এপ্রিল, ২০২১—ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। ইনজেনুইটি প্রথমবারের মতো তার ব্লেড ঘুরিয়ে, নিজেকে মঙ্গলের মাটির ওপর তুললো। মাত্র ৪০ সেকেন্ড ভেসে থেকে আবার নেমে এলো। কিন্তু সেই ৪০ সেকেন্ডই বদলে দিলো মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎ। এটাই ছিল **ভিনগ্রহের আকাশে প্রথম নিয়ন্ত্রিত ও সঞ্চালিত উড্ডয়ন।** নাসার বিজ্ঞানীরা একে তুলনা করলেন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্সের প্রথম ফ্লাইটের সঙ্গে। মানুষের আকাশ জয়ের নতুন অধ্যায় শুরু হলো, এবার আর পৃথিবীর নয়—মঙ্গলের আকাশে!
প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু
নাসার পরিকল্পনা ছিল মাত্র ৫টি ফ্লাইট। উদ্দেশ্য ছিল কেবল দেখানো যে, মঙ্গলের পাতলা বায়ুমণ্ডলে উড়ে থাকা সম্ভব কি না। কিন্তু ইনজেনুইটি শুধু উড়লো না—সে সীমা ভাঙলো! একটি, দুটি নয়—৭২টি সফল ফ্লাইট সম্পন্ন করলো! প্রতিবার সে আরো উঁচুতে উঠলো, আরো দ্রুত উড়লো, আরো দূর পর্যন্ত নজরদারি করলো। এখন আর এটা শুধু পরীক্ষামূলক ছিল না। এটি পরিণত হলো মঙ্গলের প্রথম আকাশচারী স্কাউট হিসেবে—যা *পারসিভিয়ারেন্স* রোভারকে পথ দেখাচ্ছিলো, বিপজ্জনক ভূখণ্ড এড়াতে সাহায্য করছিলো, এমনকি ভবিষ্যতে মানুষের অভিযান কিভাবে পরিচালিত হবে তারও দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলো।
কেন মঙ্গল??
মঙ্গল হলো আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে রহস্যময় গ্রহগুলোর একটি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, একসময় সেখানে নদী ছিল, হ্রদ ছিল—এমনকি জীবনও থাকতে পারতো! মঙ্গলকে বুঝতে পারলে, আমরা পৃথিবীর অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবো। আর যদি একদিন মানুষ মঙ্গলে বসতি গড়তে চায়, তাহলে *ইনজেনুইটি*র মতো আকাশচারী যন্ত্রই হবে তাদের চোখ ও কান। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে, দীর্ঘ ৩ বছর পর, অবশেষে এক কঠিন অবতরণে *ইনজেনুইটি*র এক ব্লেড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনো সে মঙ্গলের আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু এবার তার উড়ানের গল্প শেষ হলো। তবুও, এটি কোনো ব্যর্থতা ছিল না। বরং, তার কাজ শেষ হয়েছে—সে প্রমাণ করে দিয়েছে, স্বপ্ন সত্যি করা সম্ভব। ১৮ কোটি মাইল দূরে, পৃথিবীর বাইরের এক শূন্যপ্রান্তরে, এক ক্ষুদ্র হেলিকপ্টার জানিয়ে গেল— আমরা পারবো। আমরা আরো উড়বো।" এবং এটাই কেবল শুরু! 🚀